*আধুনিকতার প্রচারণা, বাস্তবে সেবার সংকট
*জরুরি পরীক্ষার অভাবে বাড়ছে স্বাস্থ্যঝুঁকি
ফখরুল ইসলামঃ
ফেনী শহরে রাত ৮টার পর অধিকাংশ হাসপাতাল ও ডায়াগনস্টিক সেন্টারে আল্ট্রাসনোগ্রাফি সেবা বন্ধ থাকার অভিযোগ উঠেছে। এতে জরুরি মুহূর্তে চরম ভোগান্তিতে পড়ছেন রোগীরা, বিশেষ করে প্রসূতি মা ও গুরুতর অসুস্থ রোগীরা। স্থানীয় সূত্রে জানা যায়, দিনের বেলায় বিভিন্ন বেসরকারি হাসপাতাল ও ডায়াগনস্টিক সেন্টারে আল্ট্রাসনোগ্রাফি সেবা পাওয়া গেলেও রাত নামলেই এই সেবা কার্যত অচল হয়ে পড়ে। সংশ্লিষ্ট চিকিৎসক কিংবা টেকনিশিয়ানদের অনুপস্থিতির কারণে জরুরি অবস্থায় রোগীদেরকে অন্যত্র ছুটতে হচ্ছে। অনেক ক্ষেত্রে সময়মতো পরীক্ষা না হওয়ায় রোগীর অবস্থা আরও জটিল হয়ে পড়ছে বলেও অভিযোগ রয়েছে। ভুক্তভোগীদের ভাষ্য, হঠাৎ অসুস্থতা কিংবা প্রসবজনিত জটিলতায় দ্রুত আল্ট্রাসনোগ্রাফি করানো অত্যন্ত জরুরি হয়ে পড়ে। কিন্তু রাতের বেলায় এই সেবা না থাকায় অনেক রোগীকে চট্টগ্রাম বা কুমিল্লার দিকে রেফার করা হয়। আবার কেউ কেউ বাধ্য হয়ে পরদিন সকাল পর্যন্ত অপেক্ষা করেন। এতে বাড়ছে শারীরিক ও মানসিক দুর্ভোগ। শহরের মধ্যেই যদি এমন পরিস্থিতি হয়, তাহলে গ্রামাঞ্চলের রোগীদের অবস্থা কতটা ভয়াবহ হতে পারে তা নিয়ে জনমনে প্রশ্ন উঠেছে। কারণ গ্রামীণ এলাকায় চিকিৎসা সুবিধা আরও সীমিত। সেখানে রাতের বেলায় জরুরি পরীক্ষা করাতে এসে অনেক রোগীকেই দুর্ভোগ পোহাতে হচ্ছে বলে জানা গেছে। অন্যদিকে, সাম্প্রতিক সময়ে ফেনীতে ব্যাঙের ছাতার মতো গড়ে উঠেছে অসংখ্য বেসরকারি হাসপাতাল ও ডায়াগনস্টিক সেন্টার। আধুনিক চিকিৎসা সেবার প্রচারণা থাকলেও বাস্তবে জরুরি স্বাস্থ্যসেবা নিশ্চিত করতে ব্যর্থতার অভিযোগ ক্রমেই জোরালো হচ্ছে। সচেতন মহলের দাবি, ২৪ ঘণ্টা জরুরি সেবা নিশ্চিত না করে হাসপাতাল পরিচালনার অনুমতি দেওয়া কতটা যৌক্তিক, তা খতিয়ে দেখা প্রয়োজন। বিশেষ করে প্রসূতি সেবা ও জরুরি রোগীদের ক্ষেত্রে আল্ট্রাসনোগ্রাফি সেবা বাধ্যতামূলকভাবে চালু রাখার দাবি জানিয়েছেন তারা। ফেনী সদর উপজেলার এক গৃহবধূ শারমিন আক্তার বলেন, রাতে আমার বোনের হঠাৎ পেটব্যথা শুরু হলে হাসপাতালে নেওয়া হয়। ডাক্তার জরুরি আল্ট্রাসনোগ্রাফি করতে বলেন। কিন্তু কয়েকটি হাসপাতালে ঘুরেও পরীক্ষা করাতে পারিনি। শেষে ভোর পর্যন্ত অপেক্ষা করতে হয়েছে। শহরের ব্যবসায়ী মো. রিয়াজ উদ্দিন বলেন, এত হাসপাতাল আর ডায়াগনস্টিক সেন্টার থাকার পরও জরুরি সময়ে পরীক্ষা না পাওয়া খুবই হতাশাজনক। সাধারণ মানুষ অসহায় হয়ে পড়ছে। এক প্রসূতি রোগীর স্বজন নাছিমা বেগম ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, শুধু বিলবোর্ডে আধুনিক সেবার কথা লিখলেই হবে না। জরুরি সময়ে যদি সেবা না পাওয়া যায়, তাহলে এসব হাসপাতালের প্রয়োজন কী ? এ বিষয়ে ফেনীর সিভিল সার্জন ডাঃ মোহাম্মদ রুবাইয়াত বিন করিম বলেন, জরুরি প্রসূতি সেবা নিশ্চিত করতে আমরা বদ্ধপরিকর। এ ব্যাপারে বেসরকারি হাসপাতালগুলোরও দায়বদ্ধতা রয়েছে। অতি গুরুত্বপূর্ণ সেবা না পেলে আমরা অবশ্যই ব্যবস্থা নেব। এ ধরনের অব্যবস্থাপনার জন্য ফেনী জেলায় ইতোমধ্যে ৭টি হাসপাতাল সিলগালা করা হয়েছে, ১১টি প্রতিষ্ঠানকে জরিমানা করা হয়েছে, ১৪টি প্রতিষ্ঠানের কার্যক্রম বন্ধ রাখা হয়েছে এবং ১৩টি প্রতিষ্ঠানকে সতর্ক করা হয়েছে। এদিকে, ফেনী জেলা হাসপাতাল অ্যাসোসিয়েশনের সাবেক সভাপতি হারুনুর রশীদের সঙ্গে একাধিকবার যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তিনি কোনো সাড়া দেননি। সংশ্লিষ্টদের মতে, স্বাস্থ্যসেবা খাতে কার্যকর তদারকি ও জবাবদিহিতা নিশ্চিত না হলে ভবিষ্যতে পরিস্থিতি আরও জটিল হতে পারে। আধুনিক চিকিৎসা সেবার দাবির বিপরীতে বাস্তবতার এই চিত্র এখন ফেনীবাসীর জন্য বড় উদ্বেগের কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে।